Business Talk

বরই চাষ পদ্ধতি!!!

বরই একটি সুস্বাদু ফল। দেখতেও আকর্ষণীয় এ ফলের চাহিদা দিন দিন বেড়েই চলছে। কম খরচে লাভ বেশি হওয়ায় বরই চাষ এ আগ্রহ বাড়ছে চাষিদের। এরই মধ্যে এ ফল চাষে সফলতাও পেয়েছেন অনেকে। 

বরইয়ের বৈজ্ঞানিক নাম Ziziphus zizyphus। দক্ষিণ এশিয়ায় বহুল প্রচলিত, কন্টকপূর্ণ গাছের ফল। ইংরেজিতে একে সচরাচর Jujube বা Chinese date হিসাবে আখ্যায়িত করা হয়। বাংলাদেশের প্রায় সর্বত্র, সর্বপ্রকার মাটিতেই বরই গাছ জন্মে। একটু ডিম্বাকৃতির বরইকে সচরাচর “কুল” বলে অভিহিত করা হয়। বরই গাছ ছোট থেকে মাঝারি আকারের ঝোপাল প্রকৃতির বৃক্ষ। বরই গাছের স্বাভাবিক উচ্চতা ১২-১৩ মিটার। এই গাছ পত্রঝরা স্বভাবী অর্থাৎ শীতকালে পাতা ঝরে, বসন্তে নতুন পাতা আসে। বরই গাছের ডাল-পালা ঊর্ধ্বমুখী। বৎসরের সেপ্টেম্বরে – অক্টোবরে মৌসুমে গাছে ফুল আসে। ফল ধরে শীতে। ফল গোলাকার, ছোট থেকে মাঝারি। ফল আকারে ছোট, কমবেশী ২.৫ সেন্টিমিটার। ফল পাকলে রঙ হলুদ থেকে লাল বর্ণ হয়। কাঁচা ও পাকা উভয় পদের বরই খাওয়া হয়। স্বাদ টক ও কাঁচামিঠা জাতীয়। বরই রোদে শুকিয়ে সংরক্ষণ করা যায়। পাকা বরই শুকিয়ে চাটনী প্রস্তুত করা হয়।

ক্রান্তীয় এবং উপক্রান্তীয় অঞ্চলে বরই বেশ জন্মে। এর আদি নিবাস আফ্রিকা হলেও বর্তমানে এটি বাংলাদেশ, ভারত, আফগানিস্তান, চীন, মালয়েশিয়া, অস্ট্রেলিয়া এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় কিছু অঞ্চলে বিস্তার লাভ করেছে। 

উত্তর ভারতের প্রতিটি বরই গাছে বছরে ৮০ থেকে ২০০ কেজি পর্যন্ত বরই ফলে। দশ থেকে বিশ বছর বয়সী গাছেই ফলন বেশি হয়। বরইয়ে বিভিন্ন খনিজ দ্রব্য ক্যালসিয়াম, আয়রন, ফসফরাস এবং ভিটামিন ‘এ’ ও ‘সি’ আছে।

অল্প পুঁজি ও ঝুঁকি কম থাকায় দেশের বিভিন্ন জায়গায় বরই চাষ করে অনেকেই সফালতা পেয়েছেন। বরইয়ের বাম্পার ফলনে খরচের চেয়ে লাভের পরিমাণ দুই থেকে তিন গুণ। স্বল্প সময়ে অধিক লাভ হওয়ায় প্রতি বছর বাড়ছে কুল চাষের পরিমাণ। জানা গেছে, গত বছর প্রায় ৭ কোটি টাকার বড়ই বিক্রি করেছেন বড়ই চাষিরা। যেটা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের বড় একটি হাতিয়ার হিসাবে কাজ করছে।

উন্নত জাতঃ বারি কুল ১, বারি কুল ২, বারি কুল ৩, বাউ কুল ১, বাউ কুল ২ এবং বি ইউ কুল-১ ইত্যাদি কয়েকটি উল্লেখযোগ্য কয়েকটি জাত।

বাংলাদেশে মধ্য মাঘ-মধ্য চৈত্র ও মধ্য শ্রাবণ মধ্য ভাদ্র পর্যন্ত সময় বীজ বপনের উপযুক্ত সময়।

চাষপদ্ধতিঃ গর্তের আকার হবে সোয়া ২ হাত × সোয়া ২ হাত × সোয়া ২ হাত। গর্ত করার পর চারা রোপণের ১০-১৫ দিন পূর্বে গর্ত প্রতি ২৫ কেজি পচা গোবর, টিএসটি, পটাশ ও জিপসাম সার প্রতিটি ২৫০ গ্রাম করে গর্তের মাটির সাথে মিশিয়ে গর্ত বন্ধ করে রাখতে হবে।

বীজের পরিমানঃ জাত ভেদে বীজের পরিমান শতক প্রতি ৩০০-৬২৫টি।

সার ব্যবস্থাপনাঃ ১-২ বছরের গাছে বর্ষার আগে আবার বর্ষার পরে জৈব সার ৫ কেজি, ইউরিয়া ১৫০ গ্রাম, টিএসপি ও এম ও পি ১২৫ গ্রাম হারে ভালভাবে মাটির সাথে মিশিয়ে দিন। ৩-৪ বছরের গাছে বর্ষার আগে আবার বর্ষার পরে জৈব সার ৭.৫ কেজি, ইউরিয়া ২৫০ গ্রাম, টিএসপি ও  এম ও পি ২০০ গ্রাম হারে ভালভাবে মাটির সাথে মিশিয়ে দিন।৫-৬ বছরের গাছে বর্ষার আগে আবার বর্ষার পরে জৈব সার ১০ কেজি, ইউরিয়া ৩৭৫ গ্রাম, টিএসপি ও এম ও পি ৩৫০ গ্রাম হারে ভালভাবে মাটির সাথে মিশিয়ে দিন।৭-৮ বছরের গাছে বর্ষার আগে আবার বর্ষার পরে জৈব সার ১২.৫ কেজি, ইউরিয়া ৫০০ গ্রাম, টিএসপি ও এম ও পি ৪২৫ গ্রাম হারে ভালভাবে মাটির সাথে মিশিয়ে দিন। ৯ বা এর বেশি বছরের গাছে বর্ষার আগে আবার বর্ষার পরে জৈব সার ১৫ কেজি, ইউরিয়া ৬২৫ গ্রাম, টিএসপি ও এম ও পি ৫০০ গ্রাম হারে ভালভাবে মাটির সাথে মিশিয়ে দিন ।পর্যাপ্ত জায়গা না থাকলে শাবল দ্বারা গর্ত করে সার প্রয়োগ করুন। একটি পূর্ণবয়স্ক গাছের গোড়া থেকে সোয়া ২ হাত থেকে সোয়া ৩ হাত দূর থেকে শুরু করে ৭.৫ হাত পর্যন্ত জায়গা জুড়ে সার প্রয়োগ করুন।

রোগ দমনঃ কুলের পাউডারি মিলডিউ একটি মারাত্মক রোগ। এতে ফলন হ্রাস পায়। ওইডিয়াম প্রজাতির ছত্রাক দ্বারা এ রোগ হয়ে থাকে। গাছের পাতা, ফুল ও কচি ফল এ রোগে আক্রান্ত হয়। আক্রান্ত ফুল ও ফল গাছ থেকে ঝরে যায়। গাছের পরিত্যক্ত অংশ এবং অন্যান্য পোষক উদ্ভিদে এ রোগের জীবাণু বেঁচে এবং বাতাসের মাধ্যমে বিস্তার লাভ করে। উষ্ণ ও ভেজা আবহাওয়ায় বিশেষ করে মেঘাচ্ছন্ন অবস্থায় এ রোগ দ্রুত বিস্তার লাভ করে।

প্রতিকারগাছে ফুল দেখা দেওয়ার পর থিওভিট নামক ছত্রাকনাশক প্রতিলিটার পানিতে ২ গ্রাম অথবা টিল্ট ২৫০ ইসি লিটার পানিতে ০.৫ মিলি মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে। পরবর্তীতে ১৫ দিন পর পর দু’বার স্প্রে করতে হবে।

সতর্কতাঃ বালাইনাশক/কীটনাশক ব্যবহারের আগে বোতল বা প্যাকেটের গায়ের লেবেল ভালো করে পড়ুন এবং নির্দেশাবলি মেনে চলুন। ব্যবহারের সময় নিরাপত্তা পোষাক পরিধান করুন। ব্যবহারের সময় ধূমপান এবং পানাহার করা যাবেনা। বালাইনাশক ছিটানো জমির পানি যাতে মুক্ত জলাশয়ে না মেশে তা লক্ষ্য রাখুন। বালাইনাশক প্রয়োগ করা জমির ফসল কমপক্ষে সাত থেকে ১৫ দিন পর বাজারজাত করুন।

ফলনঃ জাতভেদে ৪০- ৬০ কেজি

সংগ্রহঃ জাত অনুসারে মধ্য পৌষ থেকে মধ্য চৈত্র (জানুয়ারী থেকে মার্চ) মাসের মধ্যে ফল পাওয়া যায়। সঠিক পরিপক্ক অবস্থায় ফল সংগ্রহ করা খুবই জরুরী। অপরিপক্ক ফল আহরণ করা হলে তা কখনোই কাঙ্খিত মানসম্পন্ন হবে না। অতিরিক্ত পাকা ফল নরম ও মলিন রং এর হয়। এতে ফলের সংরক্ষণ গুন নষ্ট হয়ে যায় এবং তাড়াতাড়ি নষ্ট হয়ে যায়। ফল যখন হালকা হলুদ বা সোনালী রং ধারণ করবে এবং গন্ধ ও স্বাদ কাঙ্খিত অবস্থায় পৌছবে তখন কুল সংগ্রহ করতে হবে। সংগ্রহকালে যাতে ফলের গায়ে ক্ষত না হয় এবং ফেটে না যায় সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখুন। সকাল বা বিকেলে ঠান্ডা আবহাওয়া ফল সংগ্রহ করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *